আজ ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে মে, ২০২০ ইং

চিকিৎসা আমার মৌলিক অধিকার


মাইনউদ্দিন হাসান শাহেদ

বিশ্বের অন্তত ২১০টি দেশে করোনা ছড়িয়েছে। ভয়ংকর ছোঁয়াচে এ রোগের বিস্তার ঠেকাতে প্রাণান্ত চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। চিকিৎসা শাস্ত্রে এর কোন নিরাময় কিংবা প্রতিষেধকের ব্যবস্থা না থাকায় মানবজাতি এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দুটোই বাড়ছে। মানুষ বন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কখন এই পরিস্থিতির অবসান হবে তাও নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।
তবে খুব সহসা মানবজাতি প্রাণঘাতি এ ভাইরাস থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বেশ কয়কটি বিশেষজ্ঞ সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ ভাইরাস প্রতিরোধে ভ্যাকসিন বের হতে আরও কয়েকমাস সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে ভাইরাসের প্রকোপ কমলেও সামাজিক কিংবা শারিরীক দূরত্ব বজায় রেখেই মানুষকে চলাফেরা করেত হবে।
বিশ্বে এ পযর্ন্ত প্রায় এক লক্ষ ৭২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ লাখের কোঠায়।আমাদের দেশেও দিনদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।গত তিনদিনে এ হার আগের আক্রান্তের চেয়ে এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। এ পর্যন্ত তিন হাজার ৩৮২ জন সনাক্ত ও ১১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বলা দরকার, আমাদের সমস্যা অন্য জায়গায় মানুষ স্বাস্থ্য বিধি মানছে না। ফলে রোগের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
যাই হোক, মহামারী এ ভাইরাস ঠেকাতে আমরা কতটুকু প্রস্তুত তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের নানা অব্যবস্থাপনা ও অপর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রী নিয়েই আমাদের এ যুদ্ধে নামতে হচ্ছে। চারিদিকে সমন্বয়হীনতা। দেশের বিভাগীয় কিংবা জেলা সদর হাসপাতালগুলো করোনা রোগীর চিকিৎসায় প্রস্তুত নয়। আক্রান্ত হলেই ঢাকায় নিয়ে যেতে হচ্ছে। সামনে ঢাকায় বা রোগীর ঠাঁই কতো হবে। পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে, এখন সেটাই বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। মানুষ চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর আস্থা হারিয়েছে। তাহলে উপায় কি? না, এ ক্ষেত্রে গুটিকয়েক মানুষ দায়ী। এ জন্যে আমরা পুরো চিকিৎসক সমাজকে দায়ী করতে পারি না। যারা মেকানিজমে বসে আছেন, এ দায় তাদের। এখনই এসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিয়ে মানুষের ক্ষোভের শেষ নেই। তিনিও মানুষকে আশান্বিত করার মতো কোন বক্তব্য হাজির করতে পারছেন না। তার বক্তব্যে একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই ভরসার জায়গা। আমরা সাধারণ মানুষও তাই মনে করছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত ভিড়িও কনফারেন্স করে সারাদেশের অবস্থা জানার চেষ্টা করছেন। এখন কথা উঠেছে, আপনি কিংবা আপনার দপ্তর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবকিছু খোলাসা করেননি। সমস্যার কথা না জানিয়ে ভালো প্রস্তুতি থাকার তথ্য দিয়ে সময় নষ্ট করেছেন। এখন আপনার মন্ত্রণালয়ের অনেক গোমর ফাঁস হচ্ছে। অনেক বড় কমর্কর্তার বিরুদ্ধেও মৌলবাদী রাজনীতির সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ উঠছে। বেসামাল দূর্নীতির বিষয় সামনে আসছে।
কথা হচ্ছে, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র অনেক পুরানো। প্রায় সময় এ খাতের নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতি নিয়ে লেখালেখি ও সংবাদ প্রচার হয়ে আসছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে চিত্র পাল্টায়নি। এ খাতে বড়বড় দূর্নীতির খবর মানুষ জানে। এই দূর্যোগের সময়েও এখানকার দূর্নীতি পরায়ন কমর্কর্তাদের মন গলেনি। তারা নিম্নমানের পিপিই, মাস্ক ও চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয় করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। এ দূর্নীতির বিষয়টি গনমাধ্যমে বের হলে সারাদেশে সমালোচনার ঝড় উঠে। গতকাল সোমবার এ দূর্নীতি তদন্তে একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। এখন দেশবাসী এ দূর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত দেখতে চাই।
ভাবনার বিষয় হলো, চিকিৎসার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের যদি সুরক্ষা নিশ্চিত না হয় তাহলে এ যুদ্ধে আমাদের জয় কিভাবে সম্ভব? চিকিৎসকেরা শুরু থেকে চিকিৎসা সামগ্রীর জন্য দাবি জানিয়ে আসছিল। সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেনি। পুরো বিষয়ে সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হলো। রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে শতাধিক চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হলেন। প্রাণ হারান দুইজন চিকিৎসক। তবে সর্বশেষ জানা গেল, চিকিৎসকদের সুরক্ষার জন্য ১৬ লাখ পিপিই, পযার্প্ত মাস্কসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী আমদানি করা হয়েছে। আপাতত সরঞ্জামের অভাব নেই। এখন শুধু সঠিক নির্দেশনা ও সমন্বয়ের দরকার।
আমরা জানি সাম্প্রতিক সময়ে একজন চতুর্থ শ্রেণির কমর্চারি ও তার স্ত্রীর হাজার কোটি টাকার দূর্নীতির ঘটনা রূপকথাকেও হার মানায়। এই দম্পতি কয়েকটি উন্নত দেশে বাড়ি ঘরও করেছে। এ অপরাধ তারা একদিনে করেনি। দীর্ঘদিন ধরে তারা অনিয়ম করলেও পার পেয়েছে। এদের যারা শেল্টার দিয়ে আসছিল তাদের দূর্নীতি নিশ্চয় আরও বড়। এরা বহাল তবিয়তে দেশেই আছে। আমরা আশা করবো, এ খাতে যারা দূর্নীতি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তাদের স্বরূপও উম্মোচন করা হোক।
আমাদের দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার পাঁচটি। এর মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। মূল্যবান এই অধিকার থেকে মানুষ নানাভাবে বঞ্চিত হয়ে আসছে। কারণ রাষ্ট্র যারা চালায়, তাদের বেশির ভাগই এ দেশে চিকিৎসা নেন না। তারা বিদেশে চিকিৎসায় অভ্যস্থ। তবে এখন তো দেশেই চিকিৎসা নিতে হবে। তাতে কি,করোনায় আক্রান্ত ভিআইপিদের চিকিৎসার জন্যে নাকি আলাদা ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এখন বোঝা গেল কিছুটা তাদের উপলব্ধি হয়েছে।
শুধু তাই নয়, এ খাত নিয়ে দূর্নীতির পাশাপাশি বানিজ্যিকীকরণও কম হয়নি। চিকিৎসার এ বানিজ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কমর্কর্তা-কমর্চারির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আর সেবামূলক এ খাতটির একচ্ছত্র ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠী। এ গোষ্ঠী দেশের সবখানে হাসপাতাল ও ক্লিনিক খুলে গলাকাটা ব্যবসা চালিয়ে আসছে। এমনকি তাদের সঙ্গে অনেক সরকারি চিকিৎসকও জড়িত। এ নিয়ে কেউ কোনো দিন কথা বলেছেন বা ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে শুনিনি।
সবশেষে বলবো গতকাল সোমবার দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত চকরিয়ার একটি খবর বেশ মন খারাপ করেছে। খবরে দেখেছি , কাগজে কলমে আইসোলেশন সেন্টার করা হয়েছে। সেন্টার ঘোষণার ৪২ দিনেও এখানে রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো উপযোগী করে তোলা হয়নি। কিন্তু কেন এত উদাসীনতা? এ দায় কে নিবে? এভাবেই কি অব্যবস্থাপনায় চলবে আমাদের সেবার খাতগুলো?
লেখক :মাইনউদ্দিন হাসান শাহেদ, সিনিয়র সাংবাদিক, চকরিয়া
২১ এপ্রিল ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category
Shares